১৭ জুলাই ২০২৪, বুধবার

আর কখনোই টিম ডিরেক্টর হতে চান না সুজন

- Advertisement -

বড় দায়িত্বে থাকলে অনেকেই নাকি কাজ কমিয়ে দেন। গ্রামে লোকে বলে, “গায়ে চর্বি জমে”। খালেদ মাহমুদ সুজনের বেলায় উল্টো। প্রায় এক যুগ ধরে তিনি বিসিবির গেম ডেভেলপমেন্ট কমিটির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিভাগের চেয়ারম্যান। ক্রিকেটার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের (কোয়াব) সহ-সভাপতি ছিলেন বহুদিন, জাতীয় দলের ম্যানেজার, কখনো বা কোচ! ঘরোয়া ক্রিকেটে তো তিনি নিয়মিত মুখ। মানতে না চাইলেও সত্য, সরাসরিভাবে খালেদ মাহমুদকে চেনে এমন কোনো মানুষ যদি তার সবচেয়ে বড় নিন্দুক হয়ে থাকে, ‘ক্রিকেট বোর্ডে কিংবা ক্রিকেটের উন্নয়নে খালেদ মাহমুদ সুজন কাজ করেন না’ তা সেই নিন্দুকও কখনোই বলতে পারবে না।

সরাসরিভাবে চেনার কথা বলার পেছনে কারণ আছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটু চোখ দিলেই দেখা যাবে সুজনকে নিয়ে কতশত ট্রল, নানান সব কথা। আর এই কথাগুলো বলছে সেইসব মানুষ, যারা ব্যক্তিগতভাবে সুজনকে কখনো দেখেইনি, জানেও না। সেকারণেই যারা তাকে চেনেন, জানেন, তাদের বক্তব্য জানানোটাও বোধহয় বেশ জরুরী। তাতে অন্তত খালেদ মাহমুদ সুজনকে কিছুটা বোঝা যাবে। খুঁজলে অনেক উদাহরণ মিলবে, সবচেয়ে সুন্দর সত্যটা সাকিব-মাশরাফীর বক্তব্যেই আছে।

২১ মার্চ ২০২১, সাকিব আল হাসান বলেছিলেন, “পাপন ভাই আর সুজন ভাই ছাড়া বোর্ডের বাকিরা কি কাজ করেছে? আমাদের একাডেমি বা এইচপিতে তো তেমন কোনো কাজ দেখি না। সুজন ভাই ছাড়া কারও খুব বেশি ইনভলভমেন্ট নাই। আমরা সবসময় পাপন ভাইকে দোষ দেই। পাপন ভাই আমার কাছে মনে হয় যত বেশি চিন্তা করে, ক্রিকেট বোর্ডে খুব কম মানুষই আছে অত বেশি চিন্তা করে। সুজন ভাইও করে। এই দুই জন ছাড়া ক্রেডিট দেয়ার মানুষ তো দেখি না, যারা আসলে ক্রিকেটটা নিয়ে ভাবছে।”

সাকিব বলার ঠিক ৫ দিন পর মাশরাফী বিন মোর্ত্তজাও কথা বলেছিলেন খালেদ মাহমুদ সুজনকে নিয়ে, “বাংলাদেশের সব ক্রিকেটার-কোচকে জিজ্ঞেস করেন, তারা বলবে যে একমাত্র আস্থার জায়গা সুজন ভাই, যার কাছে কিছু বলা যায় যে আমার এই সমস্যা-ওই সমস্যা। বলার আর কোনো জায়গা নেই। সে ওই খেলোয়াড়ের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ে। উনিই একমাত্র, যিনি কাজ করেন। অফিস করেন। সারাদিন ক্রিকেট ধ্যানজ্ঞানে রাখছেন। তার ফলও গেম ডেভেলপমেন্ট পাচ্ছে। বিশ্বকাপ জয়ের পর তো ওই বিভাগকে নিয়ে আর প্রশ্ন থাকে না। এর চেয়ে বড় কিছু তো নেই।”

খেলোয়াড়দের কাছে সুজন সবচেয়ে বড় আস্থার জায়গা

অনেকেরই মানতে কষ্ট হলেও, সাকিব-মাশরাফীর বলা কথাগুলোই সবচেয়ে বড় সত্য। দেশের ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় অভিভাবক বিসিবি। কিন্তু কোনো ক্রিকেটারকে যদি নির্দিষ্ট একজনের নাম বলতে বলা হয়, তাহলে যেই নামটা ঘুরেফিরে আসবে বারবার, তা হলো খালেদ মাহমুদ সুজন। জাতীয় দলে বর্তমানে খেলছে কিংবা দলের বাইরে অবস্থান করছে অথবা আগামীতে খেলবে, এমন সব ক্রিকেটারের সবচেয়ে বড় আস্থার জায়গা তিনি। এই তো কদিন আগেই, অনূর্ধ্ব-১৯ না খেলা তিনজনকে দেখা গেল আবাহনীর ডাগআউটে, আল ফাহাদ নামের একজনের অভিষেকও হয়ে গেল লিস্ট-এ তে। ১৭ বছরের আল ফাহাদ কি দারুণ বোলিংটাই না করলেন! পরে খোঁজ নিয়ে জানা গেল, শুধু ফাহাদকেই না, অন্য দুইজনকেও খুঁজে বের করেছেন খালেদ মাহমুদ সুজন। যেই গল্প নতুন নয়; এখনকার তানজিদ তামিম, তাওহীদ হৃদয়রাও এভাবেই উঠে এসেছেন সুজনের হাত ধরে।

জাতীয় দলের সাথে অসংখ্য কাজ করেছেন সুজন

দেশের ক্রিকেটে এই মানুষটার অবদান অনস্বীকার্য। এমন অনেক হয়েছে, দল কিংবা দেশ যখনই তার প্রয়োজন অনুভব করেছে, তিনি ছুটে গেছেন। জাতীয় দলে অসংখ্যবার কাজ করেছেন টিম ডিরেক্টর হিসেবে, কখনো কখনো তো পালন করেছেন ভারপ্রাপ্ত কোচের দায়িত্বও। তাকে দলের সাথে রাখার পেছনে ক্রিকেট বোর্ডের যেই ভাবনাটা সবচেয়ে বেশি কাজ করতো তা বোধহয়, ক্রিকেটারদের মধ্যে কোনো ধরণের গ্রুপিং কিংবা সমস্যা খালেদ মাহমুদ সুজন থাকতে দীর্ঘায়িত হওয়া সম্ভব না। তার কথা অন্তত সবাই শোনে, মানে।

সবশেষ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপেও তিনি ছিলেন জাতীয় দলের সাথে। কিন্তু যেই সম্মানটা তার প্রাপ্য তা তিনি পাননি, সুযোগ হয়নি নিজের কাজটাও ঠিকঠাকভাবে করার। খালেদ মাহমুদ সুজন কাজের মানুষ, আর তিনিই যদি কাজ করার সুযোগ না পান, তাহলে সেটা তার জন্য কতটা কষ্টের হতে পারে, সেই অনুমান আমাদের সবার কিছুটা থাকার কথা।

হাথুরুসিংহের কারণেই কি জাতীয় দলে নিজের কাজ ঠিকঠাক করতে পারেননি সুজন?

শনিবার গণমাধ্যমের সাথে কথা বলার সময় অনেককিছু নিয়েই আক্ষেপ করতে দেখা গেছে সুজনকে। খুব স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছেন, জাতীয় দলের সাথে টিম ডিরেক্টর হিসেবে আর কখনোই কাজ করতে চান না তিনি। এমনকি বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান পাপনের কাছেও মিডিয়ার মাধ্যমে বিশেষভাবে অনুরোধ করেছেন, তাকে যাতে আর কখনোই জাতীয় দলের কোনো দায়িত্ব পালনের জন্য রিকোয়েস্ট না করা হয়। একপাত্র পাপন কিছু বললেই যে “না” করা কঠিন!

তবুও হয়তো কোনো এক কঠিন সময়ে, ক্রিকেট বোর্ড খালেদ মাহমুদ সুজনেরই শরণাপন্ন হবে। দেশের কথা ভেবে সুজন নিজেও হয়তো সিদ্ধান্ত বদলাবেন, আবারও ফিরবেন জাতীয় দলে। কিন্তু এমনটা যদি কখনো হয়, তাহলে তখন যাতে খালেদ মাহমুদ সুজন তার কাজটা করতে পারেন, প্রাপ্য সম্মানুটুকু অন্তত পান। আর এটা নিশ্চিত করতে হবে বিসিবিকেই। নাহলে ক্ষতিটা সবচেয়ে বেশি হবে বাংলাদেশ ক্রিকেটেরই। অবশ্য সুজনের এই সিদ্ধান্তেও তো কম ক্ষতি হলো না। ঠিক কতটা তা এইমুহূর্তে বোঝা কঠিন। তবে এখন যা অদৃশ্যমান, সময়ের সাথে সাথে সেটা ঠিক পরিস্কার হয়ে উঠবে। তখন সুজনের সবচেয়ে বড় সমালোচকটাও হয়তো আফসোস করবে, ট্রল করা মানুষগুলোর ভাবনাও যাবে বদলে।

- Advertisement -spot_img
- Advertisement -

সর্বশেষ

- Advertisement -
- Advertisement -spot_img