২০ মে ২০২৪, সোমবার

সাকিবের মতোই বড় হতে পারে বাংলাদেশ ক্রিকেট

- Advertisement -

বাংলাদেশ ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় সুপারস্টার কে? কোনো না ভেবেই বলে দেয়া যায় ‘সাকিব আল হাসান।’ বিশ্ব ক্রিকেটে বাংলাদেশকে যে নতুন করে চিনিয়েছেন সাকিবই! সাকিবের শতশত অর্জন তো বিশ্ব ক্রিকেটে তুলে ধরেছে বাংলাদেশকেই। ছোট একটা দেশ থেকে হয়েছেন বিশ্বসেরা; ক্রিকেট ইতিহাসের একমাত্র অলরাউন্ডার, যিনি ক্রিকেটের তিন ফরম্যাটে একই সময়ে ছিলেন অলরাউন্ডারদের র‍্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষে। বিভিন্ন সময়ে নিজের অলরাউন্ডিং পারফরম্যান্স দিয়ে ছাপিয়ে গেছেন ইয়ান বোথাম, কপিল দেব, জ্যাক ক্যালিসদের মতো তারকাকেও!

একসাথে তিন ফরম্যাটেই ছিলেন বিশ্বসেরা

টেস্ট ক্রিকেটে সবচেয়ে দ্রুততম ৩০০০ রান ও ১৫০ উইকেট নেওয়ার কৃতিত্ব সাকিবের। ওয়ানডে ক্রিকেটে সবচেয়ে দ্রুততম সময়ে ৬০০০ রান ও ২৫০ উইকেটের মাইলফলক স্পর্শ করেছেন সাকিব। আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে ১৫০০ রান এবং ১০০ উইকেট তো নেই আর কারোরই। সাকিবই ক্রিকেট ইতিহাসের একমাত্র অলরাউন্ডার, যাঁর বিশ্বকাপে এক হাজার রানের সঙ্গে আছে ৩০টি উইকেটও। ওয়ানডে বিশ্বকাপে সাকিবই একমাত্র খেলোয়াড় যিনি এক বিশ্বকাপে ৬০০ রান ও ১০ উইকেট নিতে পেরেছেন। এই অর্জন নেই ক্রিকেট ইতিহাসেই আর কারোর।

প্রথমে ওয়ানডেতে বিশ্বসেরা হওয়া সাকিব পুরো ক্য়ারিয়ারে আলো ছড়িয়েছেন টেস্ট, আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতেও

ক্রিকেট যদি একক খেলা হতো, তাহলে কি সাকিব সর্বকালের সেরা অলরাউন্ডার হয়ে যেতেন? উত্তর যেটাই হোক না কেনো, দিনশেষে ক্রিকেট তো ব্যক্তিকে ছাড়িয়ে দলেরই খেলা। আর এখানেই সাকিব পিছিয়ে। তানাহলে বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে ওমন অতিমানবীয় পারফরম্যান্স করার পরে সাকিব তো ক্রিকেট ইতিহাসের সর্বকালের সেরা অলরাউন্ডারের অংশই হয়ে যাওয়ার কথা। সাকিবের দল যদি অষ্টম না হয়ে প্রথম, দ্বিতীয় কিংবা সেমিফাইনাল খেলতো তাহলেও কি দৃশ্যপটটা একইরকম থাকতো? কখনোই না। সাকিব বড় খেলোয়াড় হলেও, বাংলাদেশ তো এখনো বিশ্ব ক্রিকেটে হতে পারেনি বড় কোনো দল! বড় দল হতে পারেনি বলেই হয়তো, ছোট করেই দেখা হয় টাইগার খেলোয়াড়দের। বড় খেলোয়াড় হয়েও প্রাপ্য সম্মানটা পান না সাকিবের মতো তারকাও!

২০১৯ বিশ্বকাপে ব্যাট হাতে ৬০৬ রান করেছেন সাকিব

২০১৯ সালে ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগে (আইপিএল) সাকিব আল হাসান খেলেছিলেন সানরাইজার্স হায়দাব্রাদের হয়ে। খেলেছিলেন বললে বোধহয় কিছুটা ভুলই হবে। এরচেয়ে বরং বলা ভালো, সাকিব ছিলেন সানজাইজার্স দলের সদস্য। প্রথম ম্যাচে মাঠে নামার পর বাদ পড়েছেন একাদশ থেকেই, সবমিলিয়ে ওই মৌসুমে খেলেছিলেন তিনম্যাচ। দলের বিদেশিরা যেভাবে খেলছিলেন এবং কোচ টম মুডির ভাবনা সাকিবকে বুঝিয়ে দিয়েছিলো আর ম্যাচ পেতে যাচ্ছেন না তিনি।

পুরো মৌসুমে খেলেছিলেন মাত্র ৩টি ম্যাচ

সময়টাকে ভালোভাবে কাজে লাগানোর জন্য সাকিব বসে না থেকে ডেকে নিয়েছিলেন প্রিয় কোচ মোহাম্মদ সালাউদ্দিনকে; লক্ষ্য ২০১৯ আইসিসি ওয়ানডে বিশ্বকাপের জন্য সেরা প্রস্তুতি। এরপরে বিশ্বকাপে সাকিব যা করেছেন তা সবার জানা। ৮ ম্যাচে ৬০৬ রানই শুধু নয়, নিয়েছেন ১১টি উইকেটও!

বিশ্বকাপের আগে ডেকে নিয়েছিলেন প্রিয় গুরুকে

নিষেধাজ্ঞার কারণে ছিলেন না ২০২০ আইপিএলে, ২০২১ আইপিএলে সাকিব ফিরলেন পুরোনো ক্লাব কলকাতা নাইট রাইডার্সে। বিশ্বকাপের আগে সেরা প্রস্তুতি নিতে আইপিএলের বিপরীতে অন্য কিছু ভাবছিলেন না বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার। প্রথম তিন ম্যাচেই কলকাতার একাদশে ছিলেন সাকিব; ১০ ওভার বল করে ৮১ রানে পেয়েছেন ২টি উইকেট। ব্যাট হাতে তিন ম্যাচে সংগ্রহ ৩৮ রান; নিশ্চিতভাবেই সাকিবসুলভ নয়। সাকিব এরপর বাদ পড়েছেন একাদশ থেকেই। সেই থেকে কেকেআরের ডাগআউট আর সাকিব যেন হরহর আত্মা।

কলকাতা দলেও হচ্ছে না সুযোগ

মাঝপথে করোনার কারণে বন্ধ হয়ে যায় আইপিএল; ভেন্যু পরিবর্তন করে নিয়ে যাওয়া হয় সংযুক্ত আরব আমিরাতে। ১৯ সেপ্টেম্বর থেকে আবার মাঠে গড়িয়েছে আইপিএলের দ্বিতীয় পর্ব। ঘরের মাঠে নিউজিল্যান্ড এবং অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সাকিবের দুর্দান্ত পারফরম্যান্স আশা দেখাচ্ছিল আইপিএলে কলকাতার সেরা একাদশে সাকিবের জায়গা পাওয়া নিয়েও। কিন্তু, বিশ্বকাপের আগে আবারও সাকিব একাদশের বাইরে। কারণ কি দলের কম্বিনেশন নাকি অন্যকিছু? দৃশ্যপটের আড়ালে থাকা গল্পটা যেটাই হোক না কেনো, ইতোমধ্যে অনেকেই দুইয়ে দুইয়ে চার মেলাতে শুরু করেছে। স্বপ্ন দেখছে  ওমানে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে দুর্দান্ত সাকিবের। সাকিব যে অবহেলার জবাব নিজের পারফরম্যান্স দিয়েই দিয়ে এসেছেন এতকাল!

২০১৯ বিশ্বকাপে সাকিবের পারফরম্যান্স ছিল অবিশ্বাস্য

২০১৯ বিশ্বকাপ চলাকালীন ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘টেলিগ্রাফ’ সাকিব আল হাসানকে নিয়ে লেখা এক প্রতিবেদনে বিশ্বসেরা অলরাউন্ডারকে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বলেছিল, “সাকিবকে একটু খাটো করে দেখার প্রবণতা আছে। বিষয়টি কৌতূহল-জাগানিয়া। সে যাদের সঙ্গে কিংবা বিপক্ষে খেলছে, এজন্য তাকে খাটো করে দেখা হয় না। তার দুর্দান্ত আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের উত্থান দেখা ভক্তদের জন্যও নয়। কিংবা আইপিএলে অসাধারণ প্রত্যাবর্তন অথবা ২০১৫ সালে আইসিসি র‌্যাঙ্কিংয়ে একমাত্র খেলোয়াড় হিসেবে একই সময়ে তিন সংস্করণে শীর্ষে থাকার জন্যও নয়। আসলে সাকিবকে খাটো করে দেখার মধ্য দিয়ে একটি সত্যও উঁকি দেয়, সাকিব ক্রিকেটের কোনো বড় দলের খেলোয়াড় নন”

বড় ভাই মাশরাফীর সাথে সাকিব

সাকিব বড় দলের খেলোয়াড় নন, কিন্তু সাকিব ছোট খেলোয়াড়ও তো নন। তার এত এত অর্জন তো অন্তত মিথ্যে নয়, পরিসংখ্যান তো কখনোই মিথ্যে বলে না। সাকিব যে যোগ্য সম্মান পান না, সেটা একবার বলেছিলেন বাংলাদেশ জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা, “খারাপ লাগে যখন একজন ধারাভাষ্যকার কোনো বড় দলের খেলোয়াড়ের পক্ষ নেয়। আসলে এখানে তো টাকাটাই বিষয়, শুধু সাজানো কথাই ওরা বলে যাচ্ছে। আমি সহানুভূতির কথা বলছি না। কিন্তু যে ভালো খেলছে, তাকে ভালো বলবো না কেন? যেমন সাকিব! সাকিবকে কেন বলবে না ও ভালো খেলোয়াড়? আমরা ছোট দল হতে পারি, সাকিব তো ছোট খেলোয়াড় না”

সবসময়ই বাংলাদেশকেই কেনো অবহেলিত হতে হয় বুঝছিলেন না বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার

২০১৯ বিশ্বকাপ খেলতে যাওয়ার আগে সাকিব বলেছিলেন একটা কিক তার জীবন বদলে দিয়েছে। কি সেই কিক, তা খোলাসা করেছেন এক বছরের নিষেধাজ্ঞা কাঁটিয়ে দেশে ফিরে। গণমাধ্যমের সাথে সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “যখন বুঝতে পারলাম সানরাইজার্স একাদশে ফেরার আমার আর সম্ভাবনা নেই, তখন ভাবলাম, ‘আমাদের সাথেই কেন এমন হয়?’ স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশ থেকে খেলতে গিয়েছি এটা একটা মাইনাস পয়েন্ট। কারণ, বিশ্বক্রিকেট আমাদেরকে নিয়ে কখনোই ওভাবে চিন্তা করে না”

বড় দলগুলোর বিপক্ষে জয়ের ম্যাচগুলোতেও সাকিব ছিলেন দুর্দান্ত

বিশ্বক্রিকেট যে বাংলাদেশকে নিয়ে সেভাবে ভাবে না, তা নাহয় বোঝা গেল। কিন্তু এর পেছনে দায়টা কি শুধুই বাংলাদেশের? টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার পেরিয়েছে বিশ বছর, বড় দলগুলোর সাথে নেই তেমন কোনো সাফল্য। যা এসেছে, সেটাও কালেভদ্রে। কিন্তু, এখানে বাংলাদেশেরই বা দোষটা কোথায়! বড় দলগুলোও তো খেলার অনাগ্রহ প্রকাশ করেছে বেশ কয়েকবারই, কেউ কেউ চায়নি খেলতেই। বড় দল হতে গেলে নাকি জয়ের অভ্যাস থাকতে হয় তথাকথিত বড় দলগুলোর বিপক্ষে। কিন্তু সেই সুযোগটাই তো মিলছে না টাইগারদের। যখনই সুযোগ এসেছে, নিজেদের সেরাটা প্রতিবারই নিংড়ে দিয়েছে সাকিব-মুশফিকরা। ঘরের মাঠে টেস্ট ক্রিকেটে অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ডের মতো পরাশক্তিদের হারানোটা তো অন্তত সেটাই প্রমাণ করে। ওয়ানডেতে তো হারহামেশাই বড় দলগুলোকে হারাতে দেখা যায় টাইগারদের, টি-টোয়েন্টিতেও সেই অভ্যাসটা তৈরী করার পথে সাকিব-রিয়াদরা। ঘরের মাঠে অজি-কিউই বোধ তো অন্তত সেই ইঙ্গিতই দেয়।

বড় খেলোয়াড় হতে গেলে বড় দল হতে হবে বাংলাদেশকেও

সাকিব চেয়েছিলেন এমন কিছু করে দেখাতে, যাতে পুরো বিশ্বও বাংলাদেশের কদর করতে শুরু করে। সাকিব কতোটুকু পেরেছেন তার প্রমাণ মেলে বিশ্বকাপে বিশ্বসেরা অলরাউন্ডারের অতিমানবীয় পারফরম্যান্সেই। একের পর এক রেকর্ড ভেঙ্গে গড়েছেন, কোথাও কোথাও তো রেকর্ডবুকে তিনিই একমাত্র। কিন্তু সাকিব যতোই নিজেকে শীর্ষে নিয়ে যাক না কেনো, দিনশেষে বড় খেলোয়াড় হতে গেলে যে খেলতে হয় বড় দলেই! নিজে বড় খেলোয়াড় সেটা সাকিব প্রমাণ করেছেন অসংখ্যবার। কিন্তু, বিশ্বক্রিকেটে সাকিব যে সেদিনই বড় খেলোয়াড় হবেন, যেদিন বড় দল হবে বাংলাদেশও! আর সেটার জন্য দলগত পারফরম্যান্সে টাইগারদের ছাড়িয়ে যেতে হবে নিজেদের। বিশ্ব ক্রিকেটে হয়ে উঠতে হবে এক আতঙ্কের নাম। সাকিব যদি দুর্দান্ত সব খেলোয়াড়দের পেছনে ফেলে বিশ্বসেরা হতে পারেন, তাহলে বড় দল হতে পারে বাংলাদেশও। আর এজন্য জিততে হবে ভারত, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ডের মতো দলগুলোর বিপক্ষে, যেভাবে বড় বড় সব খেলোয়াড়দের পেছনে ফেলে বিশ্বসেরা হয়েছেন সাকিব নিজেও। কিংবা জিততে হবে একটা বিশ্বকাপের ট্রফি!

- Advertisement -spot_img
- Advertisement -

সর্বশেষ

- Advertisement -
- Advertisement -spot_img